মে দিবস পালন এখন ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে

লিখেছেন লিখেছেন নুরুল্লাহ মাসুম ৩০ এপ্রিল, ২০১৩, ০৪:০৯:৩৪ বিকাল

ইতিহাসের যে বাঁকে আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষেরা মে দিবসের আলোকবর্তিকা জ্বেলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্ব তেমনি এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান দেয়ার দিন পহেলা মে। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের এক ঐতিহাসিক গৌরবময় দিন। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হলেও ‘মে দিবস’ নামেই অধিক পরিচিতি লাভ করেছে দিনটি। এদিন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। মে দিবস শ্রমিকদের একটি বড় বিজয়। রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকেরা বিজয়ের ইতিহাস রচনা করেছে। দিন বদল হয়েছে, উন্নত প্রযুক্তির আশীর্বাদে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তবে দিন বদলের ছোঁয়া লাগেনি শ্রমিকদের জীবনে। ফলে দেখা যায় আবারও বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।

বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের মত আমাদের দেশেও মে দিবস পালন করাটা ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। মালিকপক্ষ অবশ্য বলতে পারেন, শ্রমিকরা এ দিনটিতে ছুটিতো পাচ্ছে। হ্যা, সরকার দিনটিকে সরকারী ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ দিনটিতে রাষ্ট্রপতি, সরকার প্রধান ও সংসদের বিরোধী দলের প্রধানও বাণী দিয়ে থাকেন। শ্রম মন্ত্রণালয় আয়োজন করে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানমালা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুর শ্রমিক সংগঠনগুলো বর্নাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করে থাকে। শ্রমিকরা (অবশ্যই কিছু সংখ্যক) নেচে-গেয়ে কিছু সময় আনন্দ করে। সহযোগী সংগঠন বা অঙ্গ সংগঠন যে নামেই হোক, কিছু শ্রমিক সংগঠন থাকলেও সেগুলো প্রকৃত শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করে কি না তা শ্রমিকরাই বাল জানেন। এ দনিটিতে প্রচার মাধ্যমগুলোর আয়োজনও থাকে চোখে পড়ার মত। তবে প্রকৃতার্থে মে দিবসের আর্জন কতখানি, শ্রমিকরা তা অনুধাবন করতে পারছে, বিশেষত পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা সব চেয়ে বেশী বুঝতে পারছে। মে দিবস তাদের কষ্ট বাড়িয়েছে বই কমায় নি। না জেনে গাধার মত খাটতে যতটা না কষ্ট, সুযোগের কথা জেনে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কষ্ট অনেক বেশী। সে কথা লিখে কি আর বোঝানো যাবে?

শ্রমিকের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে বিশ্বের প্রথম শ্রমিক ধর্মঘট হয়েছিল অবিভক্ত বঙ্গে। ১৮৬২ সালের মে মাসে অর্থাৎ শিকাগোর ঘটনার ২৪ বছর আগে। ঐ ধর্মঘট ডেকেছিলেন রেলওয়ে শ্রমিকরা। রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের শ্রমিকদের মধ্যে কর্মঘন্টা বিভাজন ছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। হাওড়া স্টেশনের সহস্রাধিক রেল শ্রমিক দশ ঘন্টার বদলে আটঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট করেছিল। ঐ ধর্মঘটের সংবাদ ছাপা হয়েছিল ৫ মে, ১৮৫২, বাংলা ২৩ বৈশাখ ১২৬৯ সনে প্রকাশিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সোম প্রকাশ’ পত্রিকায়। ‘বিবিধ সংবাদ’ শিরোণামে পত্রিকাটির ৩০৫ পৃষ্ঠায় ধর্মঘটের খবর ছাপা হয়। ঐ সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘সম্প্রতি হাবড়ার রেইলওয়ে স্টেশনে প্রায় ১২০০ মজুর কর্মত্যাগ করিয়াছে। তাহারা বলে লোকোমোটিব (গাড়ি) ডিপার্টমেন্টের মজুরেরা প্রত্যহ আটঘন্টা কাজ করে। কিন্তু তাহাদিগকে দশঘন্টা পরিশ্রম করিতে হয়। কয়েক দিবসাবধি কার্য্য স্থগিত রহিয়াছে। রেইলওয়ে কোম্পানি মজুরদিগের প্রার্থনা পরিপূর্ণ করুন; নচেৎ লোক পাইবেন না।’ ঐ ধর্মঘট এখনো বিশ্বের প্রথম সংগঠিত ধর্মঘট হিসেবে চিহ্নিত। সেই পথ ধরেই বুঝি ইউরোপ, আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণী অধিকার রক্ষার আন্দোলনে এগিয়ে গিয়েছিল। এ যেন ‘আজ বাংলা যা ভাবে, কাল বিশ্ব তা ভাবে’। অবশ্য রেল ধর্মঘটের আগে এদেশেই ১৮২৩ সনে পালকির বেহারারা কর্মবিরতি পালন করেছিল; যা নাড়া দিয়েছিল ইংরেজ শাসককে। ধর্মঘট আরো একটি হয়েছিল ১৮৩৫ সালে। নদী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মালবাহকরা ধর্মঘট করেছিল। এর প্রভাব পরেছিল পণ্যের মূল্যে সে আমলে। তবে ঐ দু’টি ধর্মঘট কোন সংগঠিত ধর্মঘট ছিল না। সংগঠিত ক্ষেত্রের আধুনিক শিল্প শ্রমিকদের কাজের ঘন্টা কমানোর দাবিতে আন্দোলনের প্রথম নথিভূক্ত ঘটনা এই রেল শ্রমিক ধর্মঘট।

বাংলার রেল ধর্মঘটের ৪ বছর পর ১৮৬৬ সালে বাল্টিমোড়ে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা একজোট হয়ে কাজের দিন ৮ ঘন্টায় নামিয়ে আনার দাবিতে প্রভাব নেয়। তারপর দাবি আদায়ে শুর“ হয় আন্দোলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তখন বিকশিত হচ্ছে ফোর্ড-রকফেলারদের সাম্রাজ্য। এর পরের ইতিহাস সকলের জানা।

পয়লা মে, ১৮৮৬। শনিবার। স্বাভাবিক কাজের দিন। শ্রমিকরা কারখানায় যাবার পরিবর্তে নেমে আসে রাজপথে, কারখানার চাকা বন্ধ। শ্রমিকরা চলছে মিশিগান এভিনিউর মিছিলে যোগ দিতে। ‘আট ঘন্টা জুতো পায়ে’ দিয়ে, ‘আট ঘন্টা চুরুট’ মুখে তাদের। মিছিল গিয়ে শেষ হলো লেকফ্রন্টে। দাবি আদায়ের কথা উঠে এলো ভাষণে। সুনসান সমাবেশ। কোথাও কোন গোলমাল নেই। যে যার বাড়ি ফিরে গেল, পরদিন রোববার ছুটির দিন। সোমবারও চলে ধর্মঘট। ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার ওয়ার্কসের শ্রমিকরা ধর্মঘট ভাঙতে আসা ঠ্যাঙারদের মোকাবেলা করতে গেলে পুলিশ গুলি চালায়। ছয়জন শ্রমিক নিহত হয় ঘটনাস্থলেই। পরদিন প্রতিবাদ সভা হে মার্কেট স্কয়ারে। আকষ্মিকভাবে পুলিশ এসে সমাবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। সমাবেশের ভীড়ে তখন আত্মগোপনকারী অন্তর্ঘাতকরা, ছুঁড়ে দিল বোমা। প্রচন্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারদিক। একদিকে বোমায় আহত মানুষ, অন্যদিকে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে সমাবেশে উপস্থিত শ্রমিকদের উপর।

১২৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালে শ্রমজীবি মানুষ সেদিন স্পষ্ট করেছিল, অত্যাচার করে কখনো কাউকেই খুব বেশিদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না। শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি পাবার অধিকার সব শ্রমিকই রাখে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার পাওনা পরিশোধ করার কথাতো সেই চৌদ্দশ বছর আগেই বলা হয়েছে। তারপরও কি বলা যাবে পূরণ হয়েছে সে সব? কিংবা ভাগ্যের হেরফের ঘটেছে তেমন? তবে কি এক নিগড় থেকে আরেক নিগড়ে পৌঁছা? এটাতো সত্যিই ক্রীতদাসের জীবন থেকে বেরিয়ে আসা; রক্ত ঢেলে দিয়ে শ্রমজীবির শ্রমের কর্ম সময় আটঘন্টা নির্ধারণ করতে পারা, সে এক যুগান্তকারী ঘটনা অবশ্যই। আর এই যে অর্জন, তা অনুপ্রাণিত করেছে বৈকি, বিশ্বের শ্রমজীবি মানুষকে যার যার পরিধিতে।

১২৬ বছর আগের সেদিনে যে অধিকার অর্জিত হয়েছিল; যে সংহতির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, সময়ের পরম্পরায় নানা আবর্তন-বিবর্তনে বিষয়গুলো স্বস্থানে থাকেনি। সচেতনভাবে সংহতির চেতনায় উদীপ্ত হয় ক’জন শ্রমিক আর? শিল্প শ্রমিকদের রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার। সেসব নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। ইতিহাসের যে বাঁকে আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষেরা মে দিনের আলোকবর্তিকা জ্বেলেছিলেন, আজকের বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্ব তেমনি এক সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের দেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, যাদের প্রতিদিনের উপার্জনে প্রতিদিন চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ মজুরি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নির্ধারিত দারিদ্র্য সীমার নিচে। ইতিমধ্যে সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। এসকল পদক্ষেপের সুফল ৫ কোটি মজুরি শ্রমিকের কাছে পৌঁছবে কীভাবে, তা ভাবতে হবে? যেখানে সরকারের নির্ধারিত মজুরিই একজন মানুষকে বাধ্য করছে দাারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতে। অধিকাংশ শিল্পখাতে শ্রমিকের জন্য মজুরির কোনো নির্ধারিত মাশ্রন্ডই নেই, সেখানে শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করবে? কীভাবে গার্মেন্টস শ্রমিক তার বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাবে? ৫ কোটি পরিবারকে দরিদ্র্যসীমার নিচে রেখে দারিদ্র্য বিমোচনে কতোখানি সাফল্যের মুখ দেখবে? এ প্রশ্নগুলো আজ ভাবতে হবে। তাই মজুরির প্রশ্ন আজ কেবল শ্রমিক বা তার পরিবারের কোনো স্বতন্ত্র বিষয় নয়। এর আন্তসম্পর্ক অনেক ব্যাপক ও গভীর। একে শুধু শ্রমিকের সঙ্গে বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখলে চলবে না। একে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লক্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে।

ন্যায্য মজুরি না পেলে বা মজুরিই আদৌ না পেলে, ছুটি না পেলে, কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হলে এদের নালিশ করার কোনো জায়গা নেই। অনেক ক্ষেত্রে আইন তাদের নালিশ করার অধিকার দেয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ নেই যেখানে এ অসহায় শ্রমিক যেতে পারে। আশ্চর্য হলেও সত্য, একজন নারী শ্রমিক স্ত্রী হিসেবে স্বমীর বিরুদ্ধে দেনমোহর না দেওয়া বা নির্যাতনের জন্য মামলা করতে পারে। সেই নারী শ্রমিককে তার মালিক যদি কাজ করিয়ে মজুরি না দেয় বা ঠিক সময় মজুরি পরিশোধ না করে অথবা কাজ করতে গিয়ে কারখানার অব্যবস্থাপনার জন্য সে আহত হয় তাহলে ঐ নারী শ্রমিকের নালিশ জানাবার কোনো জায়গা নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত কিছু সংখ্যক শ্রমিক ব্যতীত দেশের কোটি কোটি নারী ও পুরুষ শ্রমিকের ক্ষেত্রে আজ এ কথা প্রযোজ্য।

মে দিবস পালন যাতে ফ্যাশন থেকে সত্যিকার অর্থে শ্রমিকের দাবী আদায়ের দিনে পরিণত হয়, শ্রমিক যেন ন্যায্য মজুরী পায়, সরকার ঘোষিত ছুটি পায়, নারী শ্যমিকরা যাতে তাদের পাওনা ঠিকমত পেতে পারে; সে সব দিকে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় একটু নজর দিলে বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক পেতে পারে সত্যিকারের মে দিবসের ফসল।

বিষয়: বিবিধ

৬৮৪ বার পঠিত, ০ টি মন্তব্য


 

পাঠকের মন্তব্য:

মন্তব্য করতে লগইন করুন




Upload Image

Upload File